কনফারেন্স বোর্ডের জরিপ

অর্থনীতি নিয়ে মার্কিনদের আস্থাহীনতা ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চে

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের আস্থা হঠাৎ তীব্রভাবে কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের আস্থা হঠাৎ তীব্রভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালের পর তারা কখনো এতটা আস্থাহীনতায় ভোগেনি। আয় ও ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা মার্কিন ভোক্তাদের উদ্বেগের মাঝে রেখেছে। এ নাজুক পরিস্থিতির অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অস্থিরতা। সব মিলিয়ে মার্কিন অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ও মানুষের অনুভূতির মধ্যে একধরনের গভীর বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে জরিপে। খবর এপি।

সর্বশেষ এক বছরে মার্কিন অর্থনীতি বড় আকারে সম্প্রসারণ হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে দেশটির প্রযুক্তি কোম্পানিকেন্দ্রিক শেয়ারবাজার সূচকগুলোর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। যা চলতি বছরের শুরু থেকে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু কনফারেন্স বোর্ডের জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে ভোক্তা আস্থা হঠাৎ করে অনেকটাই কমে গেছে। আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সূচকটি এক যুগের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নিচের স্তরে নেমে এসেছে।

অর্থনীতি, শ্রমবাজার, ব্যবসা ও ভোক্তা মনোভাববিষয়ক গবেষণা সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা সূচক জানুয়ারিতে ৯ দশমিক ৭ পয়েন্ট কমে ৮৪ দশমিক ৫-এ নেমে এসেছে, যা কভিড মহামারীর সময়ের সর্বনিম্ন মাত্রার চেয়েও নিচে।

আয়, ব্যবসায়িক অবস্থা ও চাকরির বাজার নিয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রত্যাশার পরিমাপকারী সূচক চলতি মাসে ৯ দশমিক ৫ পয়েন্ট কমে ৬৫ দশমিক ১-এ নেমে এসেছে। সূচকটি ৮০-এর অনেক নিচে। এ মাত্রাকে সাধারণত ভবিষ্যৎ মন্দার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। সূচকটি টানা ১২ মাস ধরে ৮০-এর নিচেই রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোক্তাদের মূল্যায়নও কমেছে। এ সংক্রান্ত সূচকের মান ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ১১৩ দশমিক ৭-এ নেমে এসেছে।

কনফারেন্স বোর্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডানা পিটারসন বলেন, ‘জানুয়ারিতে অর্থনীতির প্রতি সাধারণ মার্কিনদের আস্থা কার্যত ধসে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা উভয় নিয়েই ভোক্তা উদ্বেগ আরো গভীর হয়েছে। সূচকের পাঁচটি উপাদানই খারাপ ফলাফল করেছে। এর ফলে সামগ্রিক সূচকটি মে ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে—এমনকি কভিড-মহামারীর সময়কার নিম্নস্তরও ছাড়িয়ে গেছে।’

কভিড-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। সাম্প্রতিক বছরে মূল্যস্ফীতির হার অনেকটা কমে এলেও জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্রোসারির দাম এখনো বেশি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রবর্তিত বড় আকারের আমদানি শুল্ক ও বাণিজ্য বিরোধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা জানুয়ারিতে বেড়েছে। জরিপে আরো বলা হচ্ছে, উত্তরদাতাদের স্বাস্থ্য বীমা ও যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে।

কনফারেন্স বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী, শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত চাকরি রয়েছে এমন উত্তর দিয়েছেন ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। কিন্তু তা ডিসেম্বরের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কম। অন্যদিকে ২০ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এখন চাকরি পাওয়া কঠিন। গত মাসে একই মন্তব্য করেছিলেন ১৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মার্কিন শ্রমবাজার এখন ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ অবস্থায় আটকে আছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চস্তরে আটকে থাকা সুদহারের কারণে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ স্থগিত রেখেছে।

মার্কিন শ্রম বিভাগ চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছে, ডিসেম্বরে ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৫৬ হাজার। বর্তমানে দেশটিতে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

২০২৫ সালের পুরোটা সময়ই মার্কিন শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ছিল দুর্বল। বিশেষ করে এপ্রিলে ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর পরিস্থিতি আগের তুলনায় খারাপ হয়। বছরজুড়ে দেশটিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৫ লাখ ৮৪ হাজার, যা ২০২৪ সালে শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া ২০ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থানের তুলনায় অনেক কম।

এ বিষয়ে নেভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হেদার লং বলেন, ‘ভোক্তা আস্থার নাটকীয় এ পতন সরাসরি নিয়োগ-সংকটের ফল। মন্দা না থাকলেও ২০০৩ সালের পর ২০২৫ সালই ছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নিরিখে সবচেয়ে দুর্বল বছর। এ পরিস্থিতিকে মোটেই ভালোভাবে নেননি মধ্যবিত্তরা।’

আস্থাহীনতা বৃদ্ধিকে ‘নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও নতুন নিয়োগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

বিভিন্ন বিশ্লেষণ বলছে, দুর্বল শ্রমবাজার সত্ত্বেও মার্কিন অর্থনীতি সম্প্রসারণ হচ্ছে। অনেক সময় পূর্বাভাসের তুলনায় দ্রুত গতির প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয়ের জোরে গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর মার্কিন অর্থনীতি দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে।

আরও